History of Thuggee: প্রাচীন ভারতের রহস্যময় “ঠগী” সম্প্রদায়ের ভয়ংকর ইতিহাস

History-of-Thuggee

রাত গভীর। চারদিকে কুয়াশা। দূরে শোনাযাচ্ছে গরুর গাড়ির ঘণ্টার শব্দ। ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে কয়েকজন পথিক। কয়েকজন নারী পাশে হাঁটছে। শিশুরা মায়ের হাত ধরে আছে। দূর থেকে দৃশ্যটি এতটাই স্বাভাবিক মনে হয়, যে কেউ ভাববে- “এরা তো সাধারণ মানুষ।”, ভদ্র, ধর্মভীরু মানুষ-, যারা নিজেদের পরিচয় দেয় সাধারণ ব্যবসায়ী বা তীর্থযাত্রী হিসেবে।


কিন্তু রাত যত গভীর হয়, ততই বদলে যেতে থাকে পরিবেশ। একটা নির্জন বট গাছের নিচে থামে কাফেলা। আগুন জ্বলে। গল্প শুরু হয়। হাসি-ঠাট্টা, দলের কিছু নারী সদস্যরা গান গেয়ে নাচে, কয়েকজনে রুটি বানায়, কেউ খাবার পরিবেশন করে, আতিথেয়তা- সবকিছু এতটাই স্বাভাবিক, কেউ সন্দেহই করবেনা যে, মৃত্যুও তাদের সঙ্গে আগুনের পাশে বসে আছে।


হঠাৎ- একটি সংকেত। এক সেকেন্ডের মধ্যে পেছন থেকে গলায় জড়িয়ে যায় হলুদ রুমাল। চোখ বিস্ফারিত। নিঃশ্বাস বন্ধ। কোনো চিৎকার নেই। কোনো রক্ত নেই। মাত্র কয়েক মুহূর্তে নিখোঁজ হয়ে যায় একজন মানুষ। এভাবেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে ছিল এক গোপন ঘাতক সম্প্রদায় ঠগী “Thugs”।


“ঠগ” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত “স্থগ” থেকে, যার অর্থ প্রতারক বা ধোঁকাবাজ। ইংরেজি শব্দ “Thug” এর উৎপত্তি এখান থেকেই।


১৮শ ও ১৯শ শতকে উত্তর ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে সক্রিয় ছিল এই গোপন সংগঠন। তারা সাধারণ ডাকাত ছিলনা। তারা ছিল সংগঠিত হত্যাকারী। ধর্ম, কুসংস্কার এবং গোপন নিয়মে বাঁধা এক অন্ধকার সমাজ।

 

ঠগীরা সাধারণত পথিকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করত। দিনের পর দিন এক সঙ্গে ভ্রমণ করত। বিশ্বাস অর্জন করত। তারপর সুযোগ বুঝে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে হত্যা করত।


সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় ছিল- তারা কখনো রক্তপাত করত না। কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল, রক্ত ঝরানো মানে দেবী কালীকে অপবিত্র করে। তাই তারা ব্যবহার করত একটি বিশেষ রুমাল- “রুমাল” বা “ফাঁসি কাপড়”। সেই কাপড়ের এক প্রান্তে বাঁধা থাকত মুদ্রা বা গিঁট। একঝটকায় গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করাই ছিল তাদের প্রধান কৌশল।


ঠগীদের জীবন ছিল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। তাদের নিজস্ব ভাষা ছিল। নিজস্ব সংকেত ছিল। এমনকি হত্যার নির্দিষ্ট নিয়মও ছিল। কে হত্যা করবে, কে লাশ গোপন করবে, কে পাহারা দেবে- সব কিছু আগেই নির্ধারিত থাকত।


তারা বিশ্বাস করত, এই হত্যাকাণ্ড কোনো অপরাধ নয়- এটি দেবী কালীর আদেশ। তাদের ধারণা ছিল, পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য মানুষ হত্যা করা প্রয়োজন। তাই দেবী নিজেই এই মানুষ গুলোকে তাদের কাছে পাঠিয়েছে।


প্রতিটি হত্যার আগে তারা লক্ষণ দেখত। পাখির ডাক, বাতাসের দিক, কিংবা কোনো অদ্ভুত শব্দ- এসবকে তারা দেবীর ইশারা মনে করত।

আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো- অনেক ঠগী ছিল পারিবারিক। বাবা থেকে ছেলে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলত এই পেশা। শিশুদের ছোট বেলা থেকেই শেখানো হতো কীভাবে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে হয়, কীভাবে হত্যা করতে হয়, এবং কীভাবে কোনো প্রমাণ না রেখে অদৃশ্য হয়ে যেতে হয়।


১৮২০-এর দিকে ব্রিটিশ শাসকরা বুঝতে শুরু করে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অস্বাভাবিক ভাবে মানুষ নিখোঁজ হচ্ছে। কেউ ফিরে আসছে না। কোনো লাশ নেই। কোনো সাক্ষী নেই। প্রথমে এটিকে সাধারণ ডাকাতি মনে করা হলেও পরে ধীরেধীরে সামনে আসে এক ভয়ংকর সত্য।


ব্রিটিশ অফিসাররা জানতে পারে- ভারতের রাস্তা, জঙ্গল এবং মরুভূমির পথে ছড়িয়ে আছে এক বিশাল গোপন নেটওয়ার্ক। যারা বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করছে।


এরপর শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম বড় মানব শিকার অভিযান। এই অভিযানের নেতৃত্ব দেন William Henry Sleeman। তিনি শুধু সৈন্য ব্যবহার করেননি। তিনি ব্যবহার করেছিলেন গোয়েন্দা কৌশল, তথ্যদাতা এবং মানসিক যুদ্ধ।


স্লিম্যান ধরা পড়া ঠগীদের মধ্যে কয়েকজনকে রাজি করান তথ্য দাতা হতে। তাদের মাধ্যমে ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে ঠগীদের গোপন পথ, সংকেত, ভাষা এবং কবরস্থানের অবস্থান। জঙ্গলের মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে অসংখ্য কঙ্কাল। কোথাও দশটি, কোথাও শতাধিক লাশ।


ব্রিটিশ রিপোর্ট অনুযায়ী, কয়েক শতাব্দীতে ঠগীদের হাতে নিহত মানুষের সংখ্যা হয়তো কয়েক লক্ষ পর্যন্ত পৌঁছেছিল- যদিও আধুনিক ইতিহাসবিদরা এই সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক করেন। তবুও এতে কোনো সন্দেহ নেই- ঠগীরা ছিল ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় ও সংগঠিত হত্যাকারী সম্প্রদায়।


ঠগীদের নিয়ে বহু গল্প আজও শোনাযায়। কেউ বলে, তারা ছিল ধর্মীয় উন্মাদ। কেউ বলে, ব্রিটিশরা ভারতীয় সমাজকে বর্বর প্রমাণ করার জন্য তাদের গল্প অতিরঞ্জিত করেছিল। আবার অনেক গবেষক মনে করেন, সত্য মাঝামাঝি কোথাও লুকিয়ে আছে।


কারণ ইতিহাসের নথিতে যেমন রয়েছে বাস্তব হত্যার প্রমাণ, তেমনি রয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক প্রচারণার ছাপও। কিন্তু একটা বিষয় অস্বীকার করা যায়না- ঠগীরা সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র ব্যবহার করত। সেটি হলো- বিশ্বাস। তারা প্রথমে বন্ধু হতো। তার পর সেই বন্ধুত্বকেই মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত করত।


আজ ভারতের বহু পুরনো রাস্তা, জঙ্গল আর ধ্বংস প্রাপ্ত সরাই খানার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঠগীদের গল্প। কুয়াশা চ্ছন্ন রাত, নির্জন পথ আর অদৃশ্য হয়ে যাওয়া পথিক, এখনও মানুষের কল্পনাকে শিহরিত করে।


ঠগীরা হয়তো ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু তাদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়- সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু সেই, যে প্রথমে আপনার বন্ধু হয়ে ওঠে।


আর তাই, যখনই কোনো অন্ধকার রাস্তা দিয়ে একা হাঁটবেন, হয়তো ইতিহাসের সেই পুরনো কথা আপনার কানে এসে বিঁধবে ঠিক এই ভাবে-

“বিশ্বাস করো… তারপর মৃত্যু দেখো।”

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url