The Odyssey: ওডিসিয়ুসের সমুদ্রযাত্রা ১০ বছরের রোমাঞ্চকর অভিযান
১০ বছরের একটি যুদ্ধ শেষ হয়েছে মাত্র, কিন্তু একজন মানুষের যুদ্ধ তখনও শুরুই হয়নি।-
প্রেমের আগুনে দশ বছর ধরে জ্বলেছিল ট্রয় নগরী। হাজারো যোদ্ধার রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর যুদ্ধক্ষেত্র। কিন্তু সেই যুদ্ধের প্রকৃত নায়ক , ইথাকার রাজা ওডিসিয়ুস - জয়ী হয়েও হারিয়ে ফেললেন নিজের বাড়ির পথ।
তার সামনে অপেক্ষা করছিল এমন এক সমুদ্রযাত্রা যেখানে প্রতিটি ঢেউ ছিল মৃত্যুর দূত, প্রতিটি দ্বীপ লুকিয়ে রেখেছিল অভিশাপ, আর প্রতিটি সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করত-সে বাঁচবে, নাকি ইতিহাসের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে!
যদি আপনাকে এমন এক দ্বীপে আটকে রাখা হয়, যেখানে মানুষ একবার ফল খেলে নিজের পরিবার, নিজের দেশ, এমনকি নিজের নাম পর্যন্ত ভুলে যায়?অথবা এমন এক গুহায় বন্দী হতে হয়, যার মালিক একজন নয়, দশজন নয় বরং এক চোখওয়ালা বিশালাকার দৈত্য- সাইক্লোপস !তার হাত থেকে পালানোর একমাত্র উপায় ছিল অসম্ভবকে সম্ভব করা। কিন্তু সেই সাহসিকতার মূল্য ছিল ভয়ংকর। আর এসবই ছিল ওডিসিয়ুসের যাত্রা মাত্র শুরু !
গ্রিক কবি হোমারের অমর মহাকাব্য “ওডিসি” শুধু একটি গল্প নয়। এটি প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, দেবতাদের অভিশাপ, সমুদ্রের রহস্য এবং একজন মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির কিংবদন্তি।
আজকের গল্পকে জানতে হলে আপনাকে অতিক্রম করতে হবে অনেক গুলো প্রশ্ন। যেমন-
কেন সমুদ্রের দেবতা পোসাইডন ওডিসিয়ুসকে অভিশাপ দিয়েছিলেন?
কীভাবে সে বুদ্ধির জোরে পরাজিত করেছিল ভয়ংকর সাইক্লোপসকে?
লোটাস-ইটারদের সেই রহস্যময় দ্বীপে আসলে কী ঘটেছিল?
আর কেন নিজের স্ত্রী পেনেলোপির কাছে ফিরে যেতে তার লেগেছিল পুরো দশ বছর?
আজ আমরা যাত্রা শুরু করব সেই অজানার পথে যেখানে ইতিহাস আর পুরাণ একসঙ্গে মিশে তৈরি করেছে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অ্যাডভেঞ্চার।
স্বাগতম ওডিসিয়ুসের অবিশ্বাস্য অভিযান !
ট্রয় যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ অনেক পেছনে ফেলে সমুদ্রের একের পর এক ঝড় পেরিয়ে, ক্ষুধা আর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে করতে ওডিসিয়ুস এবং তার সঙ্গীরা পৌঁছাল এক রহস্যময় দ্বীপে।
দ্বীপটির নাম-আইয়াইয়া (Aeaea)।
দেখতে যেন স্বর্গ। ঘন বন, রঙিন ফুল, অদ্ভুত নীরবতা আর দূরে ধোঁয়া উঠছে একটি প্রাসাদ থেকে। কিন্তু এই নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর সত্য। সেখানে বাস করতেন এক অতুলনীয় সুন্দরী নারী-সার্সি (Circe)। তিনি শুধু একজন নারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন এক জাদুকরী, যার এক ফোঁটা পানীয়ই একজন মানুষকে চিরতরে পশুতে পরিণত করে দিত।
ওডিসিয়ুসের কয়েকজন সঙ্গী প্রাসাদে প্রবেশ করতেই সার্সি তাদের আপ্যায়ন করলেন। সোনার পাত্রে পরিবেশন করা হলো সুস্বাদু পানীয়।
কিন্তু তারা জানত না প্রথম চুমুকের সঙ্গেই তাদের মানবজীবনের শেষ অধ্যায় শুরু হয়ে গেছে।
এক মুহূর্তের মধ্যেই মানুষগুলো পরিণত হলো শূকরে। তাদের চোখে তখনও মানুষের ভয় ছিল । কিন্তু মুখ থেকে বের হচ্ছিল শুধু পশুর আর্তনাদ।
ওডিসিয়ুস একাই এগিয়ে গেলেন। পথে দেবদূত হার্মিস তার সামনে উপস্থিত হলেন। তিনি ওডিসিয়ুসকে দিলেন এক অলৌকিক ভেষজ-মলি (Moly)। তিনি বললেন- “এটি তোমাকে সার্সির জাদু থেকে রক্ষা করবে।”
প্রাসাদে পৌঁছে ওডিসিয়ুসও সেই বিষ মিশ্রিত পানীয় পান করলেন। কিন্তু কিছুই হলো না। সার্সির (sirsi) চোখে প্রথমবারের মতো দেখা দিল বিস্ময়। তিনি বুঝলেন- এই মানুষটি সাধারণ কেউ নয়।
তলোয়ার হাতে ওডিসিয়ুস এগিয়ে এলেন। আর প্রথমবারের মতো জাদুকরী সার্সি ভয় পেলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি আত্মসমর্পণ করলেন। অভিশাপ তুলে নিলেন। ওডিসিয়ুসের সঙ্গীরা আবার মানুষে ফিরে এল।
কিন্তু এখানেই গল্প শেষ হয়নি। দিন কেটে গেল, সপ্তাহ কেটে গেল, একসময় পুরো একটি বছর। সার্সি এবং ওডিসিয়ুসের মধ্যে জন্ম নিল গভীর ভালোবাসা।
স্বর্গের মতো সেই দ্বীপে থেকে যেতে পারতেন তিনি। কিন্তু ইথাকায় অপেক্ষা করছিলেন আরেকজন। তার স্ত্রী- পেনেলোপি।
একদিন সার্সি বললেন- যদি সত্যিই বাড়ি ফিরতে চাও তবে তোমাকে যেতে হবে এমন এক স্থানে যেখান থেকে কেউ জীবিত ফিরে আসে না।
পাতালপুরী। মৃতদের রাজ্য। সেখানে বাস করেন ভবিষ্যদ্বক্তা টায়রেসিয়াস (Tiresias)। ওডিসিয়ুস সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পৌঁছালেন পৃথিবীর শেষ প্রান্তে।
চারদিকে শুধু কুয়াশা। সূর্যের আলোও যেন সেখানে প্রবেশ করতে ভয় পায়। তিনি রক্ত উৎসর্গ করলেন। ধীরে ধীরে অন্ধকারের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল মৃত আত্মারা।
যুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া বন্ধু, অসংখ্য বীর, এমনকি নিজের মায়ের আত্মাও। মায়ের সঙ্গে সেই সাক্ষাৎ ছিল ওডিসিয়ুসের জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্ত।
তিনি ছুঁতে চাইলেন-কিন্তু পারলেন না। কারণ মৃতদের শরীর স্পর্শ করা যায় না। অবশেষে টায়রেসিয়াস বললেন- তোমার যাত্রা শেষ হয়নি। তোমার সামনে রয়েছে এমন সব পরীক্ষা যেখানে জয়ী হলেও তোমাকে মূল্য দিতে হবে নিজের প্রিয় মানুষদের জীবনের বিনিময়ে।
সমুদ্রে ফিরে আসার পর সার্সির শেষ সতর্কবাণী মনে পড়ল। “সামনে রয়েছে মহা বিপদের দ্বিপ সাইরেন।”
তাদের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। ছিল না বিষ। ছিল কেবল সুমধুর কণ্ঠস্বর।
এমন এক গান যা শুনলে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষও নিজের মৃত্যুর কথা ভুলে তাদের দিকে ছুটে যেত।
ওডিসিয়ুস জানতেন এই গান একবার শুনলে আর ফেরা যাবে না। তাই তিনি তার নাবিকদের কানে গলিত মোম ঢেলে দিলেন। কিন্তু নিজে শুনতে চাইলেন সেই কিংবদন্তির গান। তাই নিজের কানে মোম দিলেন না।
সঙ্গিদের তিনি বললেন- “আমাকে শক্ত করে মাস্তুলের সঙ্গে বেঁধে রাখ। জতক্ষণ পর্যন্ত আমি এখানে ছট-ফট করব, ততক্ষন পর্যন্ত আমার বাঁধন খুলবে না। “সঙ্গিরা ওডিসিকে মাস্তুলের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে ফেললেন। জাহাজ এগিয়ে চলল। তারপর শুরু হলো সেই গান। এ যেন কণ্ঠ নয়, মনে হচ্ছিল স্বর্গের দেবিরা প্রণয়ের আমন্ত্রণে কাছে ডাকছে!
ওডিসিয়ুস চিৎকার করে বললেন- আমাকে ছেড়ে দাও! ওদের কাছে যেতে দাও
কিন্তু কেউ তার কথা শুনল না। কারণ তাদের কানে মোম দেওয়া আছে, তাই কারও কানেই তখন কোনো শব্দ পৌঁছাচ্ছিল না। জাহাজ ধীরে ধীরে মৃত্যুর সেই সুর পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল। ওডিসিও তখন ধীরে ধীরে শান্ত হতে লাগল।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর পরীক্ষা তখনও বাকি।
একটি সরু সমুদ্রপথ। এক পাশে- স্কিলা। ছয়টি মাথাওয়ালা এক ভয়ংকর দানব। অন্য পাশে- ক্যারিবডিস। এক বিশাল সমুদ্রঘূর্ণি যা পুরো জাহাজ গিলে ফেলতে পারে। দুটি মৃত্যুর মাঝখানে মাত্র একটি পথ।
সার্সি বলেছিলো – “ঘূর্ণির দিকে যেও না, তাহলে সবাই মরবে। বড় পাহাড়টির পাশ দিয়ে জেও, কিছু মানুষ হারাবে কিন্তু পুরো জাহাজ বাঁচবে।
ওডিসিয়ুস সিদ্ধান্ত নিলেন জাহাজ স্কিলার দিক দিয়ে এগিয়ে যাবে।
হঠাৎ অন্ধকার পাহাড়ের গুহা থেকে বেরিয়ে এলো ছয়টি বিশাল মাথার এক দৈত্য। এক ঝটকায় তুলে নিল তার ছয়জন সঙ্গীকে। তাদের আর্তনাদ সমুদ্র কাঁপিয়ে দিল। ওডিসিয়ুস কিছুই করতে পারলেন না। একজন রাজা, একজন বীর যোদ্ধা- কিন্তু সেই মুহূর্তে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অসহায়।
প্রতিটি বিজয়ের সঙ্গে ওডিসিয়ুস হারিয়েছেন নিজের মানুষদের। প্রতিটি দ্বীপ তাকে শিখিয়েছে - শক্তির চেয়ে বড় অস্ত্র হলো বুদ্ধি। আর ভালোবাসার চেয়ে বড় শক্তি পৃথিবীতে নেই। কারণ- স্বর্গসম সার্সির ভালোবাসাও তাকে থামাতে পারেনি। মৃত্যুর মুখ থেকেও তিনি ফিরে এসেছেন।
শুধু একবার নিজের স্ত্রী পেনেলোপি এবং নিজের সন্তান টেলেমেকাসকে আবার দেখার আশায়। কিন্তু ভাগ্য এখনও শেষ কথা বলেনি। সামনে অপেক্ষা করছে আরও ভয়ংকর ঝড় ।
সূর্যদেব হেলিওসের পবিত্র গবাদি পশু, জিউসের বজ্রপাত, ক্যালিপসোর রহস্যময় দ্বীপ আর সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রত্যাবর্তন ।
যেখানে ওডিসিয়ুসকে আবারও প্রমাণ করতে হবে- কেন ইতিহাস তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও কিংবদন্তি নায়কদের একজন হিসেবে মনে রেখেছে।
একজন মানুষ যিনি দৈত্যকে পরাজিত করেছেন। মৃতদের রাজ্যে প্রবেশ করেছেন আর মৃত্যুর গান শুনেও বেঁচে ফিরেছে। কিন্তু তিনি কি সত্যিই নিজের বাড়িতে ফিরতে পারবেন? নাকি দেবতাদের অভিশাপ তার শেষ আশাটুকুও কেড়ে নেবে ?
স্কিলা, ক্যারিবডিস, ঝড়, মৃত্যু আর অসংখ্য সঙ্গীকে হারানোর পর অবশেষে সমুদ্র যেন ওডিসিয়ুসকে গ্রাস করেই ফেলেছিল। জিউসের বজ্রপাতে তার জাহাজ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এক এক করে সমুদ্রে ডুবে যায় তার সমস্ত সঙ্গী।
শেষ পর্যন্ত অসীম সমুদ্রের বুকে ভেসে থাকেন মাত্র একজন মানুষ। সে আর কেউ নন, তিনি ওডিসিয়ুস।
নয় দিন, নয় রাত শুধু ঢেউ আর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই। অবশেষে তিনি ভেসে ওঠেন এক রহস্যময় দ্বীপে। সেই দ্বীপের নাম - ওজিজিয়া (Ogygia)।
সেখানে বাস করতেন এক অতুলনীয় সুন্দরী অপ্সরা - ক্যালিপসো।
তিনি আহত ওডিসিয়ুসকে আশ্রয় দিলেন। সেবা করলেন। ভালোবাসলেন। এমনকি এক অসম্ভব প্রস্তাবও দিলেন। - “এখানেই থেকে যাও, আমি তোমাকে অমর করে দেব। তোমার আর কখনো মৃত্যু হবে না।”
ভাবুন-অমরত্ব! অসীম সুখ !! আর একজন স্বর্গীয় দেবীর প্রেম-ভালোবাসা !!!
পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ হয়তো এক মুহূর্তও দেরি করত না। কিন্তু প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময় ওডিসিয়ুস সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে কাঁদতেন। কারণ অমরত্বের চেয়েও মূল্যবান ছিল তার নিজের বাড়ি। তার স্ত্রী-পেনেলোপি। তার ছেলে-টেলেমেকাস।
এভাবে সাতটি দীর্ঘ বছর কেটে যায়। শেষ পর্যন্ত দেবতাদের রাজা জিউস দেবী ক্যালিপসোকে আদেশ দেন- “ওডিসিয়ুসকে মুক্তি দাও।”
ক্যালিপসো জানতেন - ভালোবাসা কখনো বন্দিত্ব হতে পারে না। অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি বিদায় জানালেন সেই মানুষটিকে। যাকে তিনি চিরকাল নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলেন।
ওডিসিয়ুস নিজের হাতে একটি ভেলা তৈরি করলেন। সমুদ্র আবারও শুরু করল তার পরীক্ষা। কিন্তু এবার সমুদ্রের দেবতা পোসাইডনের রাগ তখনও শেষ হয়নি। কারণ বহু বছর আগে ওডিসিয়ুস তার ছেলে- একচোখা দৈত্য পলিফেমাসকে অন্ধ করে দিয়েছিলেন। ভয়ংকর ঝড় আবারও সবকিছু ধ্বংস করে দিতে চাইল। দেবী অ্যাথেনা গোপনে তাকে রক্ষা করলেন।
অবশেষে বহু বছরের যন্ত্রণার পর দিগন্তে দেখা গেল একটি পরিচিত ভূমি - ইথাকা। নিজের জন্মভূমি। নিজের রাজ্য। কিন্তু এই প্রত্যাবর্তনে ছিল না কোনো বিজয় মিছিল। কেউ তাকে চিনতে পারল না। এমনকি নিজের প্রাসাদেও তাকে প্রবেশ করতে হল একজন ভিখারির ছদ্মবেশে।
বিশ বছর। হ্যাঁ, পুরো বিশ বছর ধরে পেনেলোপি অপেক্ষা করেছেন। চারদিকে সবাই বলছিল- ওডিসিয়ুস আর বেঁচে নেই। ইথাকার অসংখ্য অভিজাত যুবক প্রাসাদে এসে বসবাস শুরু করল। তারা সবাই চেয়েছিল পেনেলোপিকে বিয়ে করে রাজা হতে। কিন্তু পেনেলোপি ছিলেন অসাধারণ বুদ্ধিমতী। তিনি বললেন- আমি একটি কাপড় বুনে শেষ করব, তারপর নতুন স্বামী নির্বাচন করব। দিনে তিনি কাপড় বুনতেন আর রাতে সব খুলে ফেলতেন।
একদিন, দুই-দিন, এক-বছর, দুই-বছর… এভাবেই কেটে গেল বহু বছর। তিনি জানতেন না ওডিসিয়ুস বেঁচে আছেন কিনা। তবুও তিনি বিশ্বাস ছাড়েননি। এই ভালোবাসা সময়ের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।
অবশেষে এল সেই দিন। পেনেলোপি ঘোষণা করলেন, যে ব্যক্তি ওডিসিয়ুসের কিংবদন্তি ধনুক টানতে পারবে এবং বারোটি কুঠারের ছিদ্র ভেদ করে তীর ছুড়তে পারবে সেই-ই হবে তার নতুন স্বামী। একে একে সবাই চেষ্টা করল। কেউ পারল না।
তারপর একজন বৃদ্ধ ভিখারি সামনে এগিয়ে এল। সবাই হাসতে লাগল। কিন্তু এক মুহূর্তের মধ্যেই তিনি সহজেই ধনুক টেনে ধরলেন। তীর ছুটে গেল। একটির পর একটি বারোটি কুঠারের ছিদ্র ভেদ করে।
প্রাসাদ নিস্তব্ধ। তারপর ভিখারি ধীরে ধীরে মাথা তুলে বললেন- আমি, আমি ওডিসিয়ুস!
পরের মুহূর্তেই শুরু হলো যুদ্ধ। বজ্রপাতের মতো উড়ে চলল তীর। তলোয়ারের ঝলকানিতে কেঁপে উঠল প্রাসাদ। বহু বছর ধরে যারা তার পরিবারকে অপমান করেছে এক এক করে সবাই পরাজিত হলো। এটি শুধু একটি যুদ্ধ ছিল না। এটি ছিল একজন রাজা, একজন স্বামী এবং একজন পিতার নিজের ঘর পুনরুদ্ধারের লড়াই।
যুদ্ধ শেষ। পুর প্রাসাদ নীরব। কিন্তু পেনেলোপি এখনও নিশ্চিত নন। এত বছর পর তিনি কি সত্যিই তার স্বামীকে ফিরে পেয়েছেন? তখন তিনি এমন একটি প্রশ্ন করলেন যার উত্তর পৃথিবীতে মাত্র দু'জন মানুষ জানত। তাদের শয্যা সম্পর্কে।
যে শয্যাটি তৈরি করা হয়েছিল একটি জীবন্ত জলপাই গাছের কাণ্ড ঘিরে। পেনেলোপি এবার ওডিসিয়ুসকে সে কথা জিজ্ঞেস করাতে সঠিক উত্তর দিলেন। পেনেলোপির চোখে জল এসে গেল। এবার আর কোনো সন্দেহ রইল না। দুই দশকের অপেক্ষার অবসান হলো। দেবতাদের অভিশাপ, সমুদ্রের ঝড়, দানব, মৃত্যু-সবকিছু হার মানল তার স্ত্রীর ভালোবাসার কাছে।
ওডিসি আমাদের শুধু একটি সমুদ্রযাত্রার গল্প শোনায় না। এটি শেখায় সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ সে নয়, যার হাতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র আছে। বরং সে, যে প্রতিটি বিপর্যয়ের পর আবার উঠে দাঁড়াতে পারে। যে ক্ষমতার চেয়ে পরিবারকে বেশি ভালোবাসে। যে অমরত্বের প্রলোভন ছেড়ে নিজের ঘরে ফিরে যেতে চায়। হাজার হাজার বছর পেরিয়ে গেছে। সাম্রাজ্য হারিয়ে গেছে। রাজারা বিলীন হয়েছে। কিন্তু ওডিসিয়ুসের নাম আজও পৃথিবীর প্রতিটি মহাকাব্যের পাতায় জীবন্ত।
কারণ প্রত্যেক মানুষের জীবনেই এক একটি "ওডিসি" আছে। কেউ লড়ে স্বপ্নের জন্য। কেউ পরিবারের জন্য। কেউ নিজের অস্তিত্বের জন্য। আর সেই কারণেই এই গল্প কখনো পুরোনো হয় না।
এবার আপনি বলুন আপনার মতে, ওডিসিয়ুসের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা কোনটি ছিল - সাইক্লোপস, সার্সি, সাইরেন, নাকি ক্যালিপসোর অমরত্বের প্রলোভন? আপনার মতামত কমেন্টে লিখে জানান।






