ফারাও খুফু থেকে মিশরের গ্রেট পিরামিড – মরুভূমির অবিশ্বাস্য কাহিনি (History of Pyramid)

History-of-Pyramid

মরু ভূমির বুক চিরে সূর্য যখন ধীরে ধীরে উঠে আসে, সোনালি আলোয় জেগে ওঠে এক অনন্ত রহস্য-মিশরের পিরামিড। বালুকা বেলায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই ত্রিভুজাকৃতি মহাকায় স্থাপত্য যেন সময়কে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলে-  আমি অমর।

 

হাজার বছরের ইতিহাস, রাজশক্তির অহংকার, ধর্ম বিশ্বাসের গভীরতা আর মানুষের অদম্য শ্রম-সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এই বিস্ময়।

সব চেয়ে বিখ্যাত পিরামিড গুলো দাঁড়িয়ে আছে গিজার মালভূমিতে। এখানেই আকাশ ছুঁয়ে থাকা ‘গ্রেট পিরামিড অব গিজা। যা নির্মাণ করেছিলেন ফারাও খুফু; প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ২৫৬০ সালে। এটি শুধু একটি সমাধি নয়; এটি ছিল এক মহাকাব্যিক ঘোষণা-ফারাও দেবতুল্য, তাঁর আত্মা মৃত্যুর পরও চিরজীবী!

 

কিন্তু এই কাহিনির সূচনা আরও আগে। পিরামিডের ধারণা জন্ম নেয় সাক্কারার স্টেপ পিরামিড-, যা নির্মাণ করেছিলেন ফারাও জোসের-এর জন্য তাঁর প্রতিভাবান স্থপতি ইমহোটেপ। এটি ছিল মানুষের ইতিহাসে প্রথম বিশাল পাথরের স্থাপত্য, যেখানে কবরকে স্রেফ মাটির নিচে নয়, আকাশের দিকে তুলে ধরার সাহস দেখানো হয়। স্তরে স্তরে সাজানো সেই পিরামিড যেন দেবতাদের সিঁড়ি।

 

এরপর শুরু হয় এক স্থাপত্য বিপ্লব। ফারাওরা বুঝতে পারেন, তাঁদের মহিমা প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো আকাশ ছোঁয়া স্মৃতিস্তম্ভ। তাই চতুর্থ রাজবংশের সময়ে নির্মিত হয় গিজার তিন বিখ্যাত পিরামিড-খুফু, খাফরে ও মেনকাউরে। খুফুর পিরামিড ছিল সবচেয়ে বড়, প্রায় ১৪৬ মিটার উঁচু,  যা হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর সর্বোচ্চ মানব নির্মিত স্থাপনা ছিল।

 

কল্পনা করুন সেই দৃশ্য- নাইল নদীর তীরে হাজার হাজার শ্রমিক, কাঁধে দড়ি, হাতে লিভার। বিশাল চুনা পাথরের ব্লক কেটে আনা হচ্ছে খনি থেকে। প্রতিটি ব্লকের ওজন দুই থেকে পনের টন। সূর্যের তাপে ঘাম ঝরছে, তবু কাজ থেমে নেই। সিনেমার মতো এক বিশাল কর্মযজ্ঞ- ড্রাম বাজছে, তদারককারীরা নির্দেশ দিচ্ছেন, স্থপতিরা মাপজোক করছেন নিখুঁত ভাবে।

 

অনেক দিন ধরে ধারণা ছিল, এসব নির্মাণ করেছে দাসেরা। কিন্তু আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। শ্রমিকরা ছিলেন দক্ষকর্মী- কৃষকরা বন্যার মৌসুমে যখন চাষ করতে পারতেন না, তখন তাঁরা রাজকীয় প্রকল্পে কাজ করতেন। তাঁদের জন্য ছিল খাদ্য, চিকিৎসা ও থাকার ব্যবস্থা। গিজার কাছেই আবিষ্কৃত শ্রমিকদের গ্রাম প্রমাণ করে, এটি ছিল একটি সংগঠিত, রাষ্ট্র পরিচালিত প্রকল্প।

 

পিরামিড নির্মাণের কৌশল আজও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ধারণা করা হয়, মাটির ঢালুর্যাম্প তৈরি করে পাথর গুলো ওপরে তোলা হতো। লিভার ও কাঠের স্লেজ ব্যবহার করা হতো। কিছু গবেষক বলেন, পাথর টানার সময় বালিতে পানি ঢেলে ঘর্ষণ কমানো হতো। প্রতিটি পাথর এমন নিখুঁত ভাবে বসানো হয়েছে যে, মাঝখানে একটি পাতাও ঢোকানো যায়না। এ যেন প্রকৌশল আর শিল্পের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।

 

গ্রেট পিরামিডের ভেতরে রয়েছে রহস্যময় করিডর ও কক্ষ, রাজকক্ষ,  রানীকক্ষ, গ্র্যান্ড গ্যালারি। সংকীর্ণ পথ ধরে ভেতরে প্রবেশ করলে মনে হয় যেন অন্য এক জগতে ঢুকে পড়েছি। দেয়ালের নীরবতা, শীতল বাতাস-সব মিলিয়ে এক অতিপ্রাকৃত আবহ। এখানে রাখা হয়েছিল ফারাওয়ের মমি, সঙ্গে সোনা, অলংকার, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী… কারণ বিশ্বাস ছিল, পরজীবনে এগুলোর দরকার হবে।

 

পিরামিড কেবল সমাধি নয়; এটি ছিল ধর্মীয় প্রতীক। সূর্যদেবতাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পিরামিডের আকার এমন ভাবে তৈরি করা হয় যেন সূর্যের রশ্মি মাটিতে নেমে এসেছে। পিরামিডের চারটি দিক প্রায় নিখুঁতভাবে চারদিকনির্দেশ করে-উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম। এত প্রাচীন সময়ে এমন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা সত্যিই বিস্ময়কর।

 

গিজার পিরামিড গুলোর পাশে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল ‘গ্রেট স্ফিংক্স অব গিজা। মানুষের মুখ ও সিংহের দেহ বিশিষ্ট এক রহস্যময় প্রহরী। ধারণা করা হয়, এটি ফারাও খাফরে-এর প্রতিরূপ। সে যেন যুগের পর যুগ পাহারা দিয়ে যাচ্ছে রাজাদের নিদ্রা।

 

সময় গড়িয়েছে, রাজবংশ পাল্টেছে, সাম্রাজ্য ভেঙেছে। কিন্তু পিরামিড রয়ে গেছে। লুটেরা, মরুভূমির ঝড়, ভূমিকম্প- কিছুই তাদের মুছে দিতে পারেনি। গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস এই পিরামিড দেখে বিস্মিত হয়ে লিখেছিলেন, এটি মানুষের শ্রম ও সংগঠনের এক অসাধারণ নিদর্শন।

 

আজও যখন সূর্য অস্ত যায়, পিরামিডের ছায়া দীর্ঘ হয়ে মরুভূমির বুকে পড়ে। মনে হয়, তারা এখনও ফারাওদের গোপন কথা ফিসফিস করে বলছে। প্রতিটি পাথরের ভেতর লুকিয়ে আছে মানুষের স্বপ্ন, ভয়, বিশ্বাস আর অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা।

 

পিরামিডের ইতিহাস কেবল স্থাপত্যের ইতিহাস নয়; এটি মানব সভ্যতার এক মহাকাব্য। এখানে আছে রাজশক্তির মহিমা, ধর্মীয় বিশ্বাসের গভীরতা, বিজ্ঞানের সূচনা আর শ্রমিকদের অবদান। মরুভূমির নীরবতার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই ত্রিভুজাকৃতি বিস্ময় আমাদের মনে করিয়ে দেয়- মানুষ যখন স্বপ্ন দেখে, তখন সে সময়কেও হার মানাতে পারে।

 

এভাবেই মিশরের পিরামিড শুধু পাথরের স্তূপ নয়; এটি ইতিহাসের জীবন্ত চলচ্চিত্র। যেখানে প্রতিটি দৃশ্য রোমাঞ্চে ভরা, প্রতিটি মুহূর্তে রহস্যের ছায়া, আর প্রতিটি ইটের ভেতরে লুকিয়ে আছে চিরন্তন অমরত্বের গল্প।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url