Cloudburst: মেঘবিস্ফোরণ কি? এটি কেন ঘটে?

natural-disaster-cloudburst

প্রচণ্ড বৃষ্টি, হঠাৎ নদীর স্রোতের মতো জল নেমে আসা আর ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞ- এসবের পিছনে দায়ী এক রহস্যময় প্রাকৃতিক ঘটনা। এর নাম হলো মেঘবিস্ফোরণ বা Cloudburst। কিন্তু মেঘ কি সত্যিই বিস্ফোরিত হয়? কেন ঘটে এই ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগ? চলুন আজকে জেনে নেই- মেঘবিস্ফোরণ কি? কিভাবে হয় এবং কেন এটি এত মারাত্মক?


প্রথমেই সহজ ভাষায় বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক।

মেঘবিস্ফোরণ আসলে কোনো বিস্ফোরণ নয়, বরং এটি এক ধরনের হঠাৎ প্রবল বৃষ্টিপাত। যখন খুব অল্প সময়ে, খুব ছোট একটি এলাকায় প্রচণ্ড পরিমাণে বৃষ্টি নেমে আসে- তখন একে মেঘবিস্ফোরণ বলাহয়। উদাহরণ স্বরূপ- কয়েক মিনিটের মধ্যে এক জায়গায় ৫০ থেকে ১০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হলে, সেটিকে Cloudburst বলা হয়। এটি সাধারণ বৃষ্টির চেয়ে অনেকগুণ বেশি শক্তিশালী।


এখন প্রশ্ন আসতে পারে- যদি এটি সাধারণ বৃষ্টিই হয়, তবে একে বিস্ফোরণ বলা হয় কেন?

কারণ, মেঘবিস্ফোরণের সময় বৃষ্টির পানির ধারা এততীব্র হয় যে মনে হয়, যেন আকাশের মেঘ  হঠাৎ করে ফেটে পড়েছে। যেমন একটি বেলুন হঠাৎ ফেটে গেলে একসাথে পানি বেরিয়ে আসে- ঠিক তেমন অনুভূত হয়। তাই এর নাম দেওয়াহয়েছে  Cloudburst বা মেঘবিস্ফোরণ।


আসুন এবার এর বৈজ্ঞানিক দিকটা দেখি-

বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্প জমে মেঘ তৈরি হয়। সাধারণত মেঘ ধীরেধীরে বৃষ্টি আকারে পানি ছেড়ে দেয়। কিন্তু পাহাড়ি অঞ্চলে বা বিশেষ কিছু আবহাওয়ায় যখন মেঘ গুলো এক জায়গায় আটকে যায় এবং হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে, তখন একসাথে প্রচণ্ড পানির ধারা নেমে আসে। এটি ঘটে মূলত তিনটি কারণে-


১.অরোগ্রাফিক লিফটিং –পাহাড়ি এলাকায় আর্দ্র বাতাস উপরে উঠে ঠাণ্ডা হয়ে যায়, ফলে অতিরিক্ত মেঘ তৈরি হয়।

২.তাপমাত্রার পার্থক্য – গরম আর ঠাণ্ডা বায়ুর সংঘর্ষে জলীয় বাষ্প দ্রুত ঘনীভূত হয়।

৩.আকস্মিক চাপ পরিবর্তন – মেঘের ভেতরে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে পানি ধরেরাখতে পারেনা, আর তখন হঠাৎ বৃষ্টি নেমে আসে।


বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মেঘবিস্ফোরণ দেখা গেলেও এটি বেশি ঘটে পাহাড়ি এলাকায়। যেমন- হিমালয় অঞ্চলে, ভারতের জম্মু-কাশ্মীর, উত্তরাখণ্ড, নেপাল এবং পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলে প্রায়ই মেঘবিস্ফোরণের ঘটনা শোনা যায়। বাংলাদেশে এটি খুব কম হয়, তবে পাহাড়ি অঞ্চলে বা চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকায় প্রবল বর্ষণের সময় আংশিক ভাবে এর প্রভাব দেখা দেয়।


মেঘবিস্ফোরণের প্রভাব সাধারণ বৃষ্টির মতো নয়, বরং এটি ভয়াবহ। হঠাৎ প্রচণ্ড পানির চাপ পাহাড় থেকে নেমে এসে ভূমিধস ঘটাতে পারে। রাস্তা, গ্রাম, সেতু, কৃষি জমি মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে যায়। নদী বা খাল হঠাৎ ফুলে ওঠে, ভয়ংকর বন্যার সৃষ্টি করে।

বহু মানুষ, গবাদিপশু এবং ঘরবাড়ি ভেসে যায়। ২০১৩ সালে ভারতের উত্তরাখণ্ডে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস মেঘবিস্ফোরণেরই ফল ছিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায়।


বিশ্ব ইতিহাসে কিছু ভয়ংকর মেঘবিস্ফোরণের কথা বিশেষ ভাবে মনে রাখাহয়- ১৯৭০ সালে স্পেনে এক মেঘবিস্ফোরণে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। ২০০৫ সালে ভারতের জম্মু-কাশ্মীরে এক ঘটনায় প্রায় হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। ২০১০ সালে লেহ অঞ্চলে ঘটেযাওয়া মেঘবিস্ফোরণে ২০০ জনের বেশি মারা যায়।


এছাড়াও গত ১৫ই আগস্ট ভারতের মাতাইল মাচা মন্দিরে ঘটে যায় মেঘ বিস্ফোরণ। এতে শত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। অসংখ্য বাড়ি ঘর ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এই ঘটনা গুলো প্রমাণ করে, প্রকৃতির শক্তি কতটা বিধ্বংসী হতে পারে।


এটি হঠাৎ ঘটে যায় বলে আগে থেকে পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। তবে আধুনিক আবহাওয়া প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এখন মেঘের ঘনত্ব, তাপমাত্রা ও বাতাসের গতিপথ বিশ্লেষণ করে কিছুটা হলেও আগাম ধারণা দিতে পারে। স্যাটেলাইট ইমেজ এবং ডপলার রাডার প্রযুক্তি এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর। প্রকৃতিকে ঠেকানো সম্ভব নয়, তবে সতর্ক থাকা যায়। যেমন-


পাহাড়ি অঞ্চলে আবহাও য়াখারাপ হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না যাওয়া। সঠিক সময়ে স্থানীয় আবহাওয়া দপ্তরের সতর্ক বার্তা অনুসরণ করা। পাহাড়ি এলাকায় ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা। এসব সচেতনতা প্রাণহানি অনেকাংশে কমাতে সাহায্য করতে পারে।


মেঘবিস্ফোরণ আসলে প্রকৃতির এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি। এটি মানুষের বোধগম্যের বাইরে হলেও বিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে আমরা আজ এর কিছুটা রহস্য উন্মোচন করতে পেরেছি। তাই ভয় নয়, সচেতনতা ও প্রস্তুতিই পারে আমাদের রক্ষা করতে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url