আল্লাহর ভয়াবহ শাস্তি! নবী লুত (আঃ)-এর জাতির করুণ সমাপ্তি
নবী লুত (আঃ) ছিলেন মহান আল্লাহর একজন সম্মানিত নবী এবং নবী ইবরাহিম (আঃ)-এর ভাতিজা। আল্লাহ তাঁকে সাদূম ও তার আশপাশের জনপদের মানুষের কাছে হিদায়াতের বাণী পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রেরণ করেছিলেন।
সেই অঞ্চলের মানুষ আল্লাহর একত্ববাদ অস্বীকার করত এবং এমন সব অশ্লীল ও জঘন্য কাজে লিপ্ত ছিল, যা পৃথিবীর অন্য কোনো জাতি আগে করেনি। তারা প্রকাশ্যে পাপাচার করত, অন্যায়-অত্যাচার চালাত, পথচারীদের নিরাপত্তা নষ্ট করত এবং আল্লাহর নির্দেশকে উপহাস করত।
নবী লুত (আঃ) দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত ধৈর্য ও ভালোবাসার সঙ্গে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। তিনি তাদের আল্লাহকে ভয় করতে, পাপ থেকে ফিরে আসতে এবং সৎ পথে চলতে আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন যে,-
যদি তারা তওবা না করে, তবে আল্লাহর কঠিন শাস্তি তাদের ওপর নেমে আসবে। কিন্তু তারা তাঁর কথা শোনার পরিবর্তে তাঁকে বিদ্রূপ করত এবং বলত, “যদি তুমি সত্যবাদী হও, তবে সেই শাস্তি নিয়ে আসো।”
একদিন আল্লাহর পাঠানো কয়েকজন ফেরেশতা সুদর্শন যুবকের রূপে নবী লুত (আঃ)-এর বাড়িতে অতিথি হিসেবে আসেন। লুত (আঃ) জানতেন না যে তারা ফেরেশতা। তিনি অতিথিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, কারণ তাঁর জাতির লোকেরা অত্যন্ত দুর্বৃত্ত ছিল। খবর ছড়িয়ে পড়তেই সেই পাপাচারী লোকেরা লুত (আঃ)-এর বাড়ির সামনে ভিড় জমায় এবং খারাপ উদ্দেশ্যে অতিথিদের তাদের হাতে তুলে দিতে বলে।
নবী লুত (আঃ) তাদের বারবার নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন এবং বলেন, “আল্লাহকে ভয় করো, আমার অতিথিদের অপমান করো না।” কিন্তু তারা কোনো কথাই শুনল না।
তখন ফেরেশতারা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করে বলেন, “হে লুত! আমরা তোমার প্রতিপালকের প্রেরিত ফেরেশতা। এরা কখনোই তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”
ফেরেশতারা লুত (আঃ)-কে নির্দেশ দেন, তিনি যেন রাতের শেষ ভাগে তাঁর ঈমানদার পরিবারকে নিয়ে শহর ত্যাগ করেন এবং কেউ যেন পেছনে ফিরে না তাকায়। তবে তাঁর স্ত্রী ঈমান গ্রহণ করেননি। তিনি গোপনে পাপাচারী লোকদের পক্ষ নিতেন। তাই আল্লাহ জানিয়ে দেন যে তিনিও অবাধ্যদের সঙ্গেই শাস্তি ভোগ করবেন।
ভোর হওয়ার আগেই নবী লুত (আঃ) তাঁর অনুসারীদের নিয়ে শহর ছেড়ে চলে যান। এরপর আল্লাহর ভয়াবহ শাস্তি নেমে আসে। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী,-
ফেরেশতা জিবরাইল (আঃ) আল্লাহর আদেশে পুরো জনপদকে উল্টে দেন এবং তাদের ওপর শক্ত পাথরের বৃষ্টি বর্ষিত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। অবাধ্য ও পাপাচারী সবাই ধ্বংস হয়ে যায়, আর কেবল ঈমানদাররাই রক্ষা পান।
নবী লুত (আঃ)-এর ঘটনা আমাদের বহু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।–
প্রথমত, আল্লাহর আদেশ অমান্য করে প্রকাশ্যে পাপাচারে লিপ্ত হলে তার ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সত্যের দাওয়াত দিতে গিয়ে বাধা ও উপহাসের মুখোমুখি হলেও ধৈর্য হারানো উচিত নয়।
তৃতীয়ত, পরিবার বা আত্মীয়তার সম্পর্ক কাউকে রক্ষা করতে পারে না, যদি সে ঈমান ও সৎকর্ম থেকে দূরে থাকে।
কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহর নির্দেশ ছিল-নবী লুত (আঃ) রাতের শেষ ভাগে তাঁর পরিবার ও মুমিনদের নিয়ে শহর ছেড়ে চলে যাবেন এবং কেউ যেন পেছনে ফিরে না তাকায়। কিন্তু তাঁর স্ত্রী ঈমান আনেননি; তিনি অন্তরে অবাধ্য জাতির পক্ষেই ছিলেন এবং তাদের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করতেন।
লুত (আঃ)-এর স্ত্রীর পরিণতি তারই প্রমাণ। কুরআনের মূল বক্তব্য হলো, তিনি অবিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং তাদের প্রতি অনুগত ছিলেন, তাই তিনি ধ্বংসপ্রাপ্তদের সঙ্গেই শাস্তি ভোগ করেন (সূরা হূদ ১১:৮১, সূরা আল-হিজর ১৫:৬০, সূরা আত-তাহরীম ৬৬:১০)।
সর্বশেষ, আল্লাহ ন্যায়বিচারকারী। যারা ঈমান আনে ও সৎপথে চলে, আল্লাহ তাদের রক্ষা করেন; আর যারা সীমালঙ্ঘন করে, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন জবাবদিহি।
এই ঘটনা আজও মানবজাতির জন্য একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা। আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা, নৈতিক জীবনযাপন করা এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকাই প্রকৃত সফলতার পথ।
-%E0%A6%8F%E0%A6%B0-%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B0-%E0%A6%AD%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%B9-%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%A3%E0%A6%A4%E0%A6%BF.jpg)