ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্তে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব! Iran war news today

us-vs-iran-trump-decision-puts-the-world-on-the-brink-of-world-war-3

ডোনাল্ড ট্রাম্প- একটি অভিশাপের নাম, যা বিশ্ব রাজনীতিতে বিতর্ক, উত্তেজনা এবং অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্তের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তার প্রেসিডেন্সির সময় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে অনেকেই মনে করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুধু সময়ের ব্যাপার।


সবকিছুর শুরুটা ছিল ধীরে ধীরে, কিন্তু পরিকল্পিতভাবে। ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন হঠাৎ করেই ইরানের সঙ্গে করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নেয়। এই চুক্তি, যা একসময় শান্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল, সেটিকে “ভয়ংকর ভুল” বলে আখ্যা দেন ট্রাম্প। এরপরই শুরু হয় অর্থনৈতিক চাপ। ইরানের ওপর একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ইরানের অর্থনীতি ধসে পড়তে থাকে, আর জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে।


কিন্তু এখানেই শেষ নয়! পারস্য উপসাগরে তেলবাহী জাহাজে রহস্যজনক হামলা, সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন আক্রমণ- এসব ঘটনার জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। উত্তেজনা ক্রমেই বাড়তে থাকে। বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ!! কোনো বড় সংঘর্ষ কি আসন্ন?


তারপর আসে সেই নাটকীয় মুহূর্ত- ২০২০ সালের জানুয়ারি।

একটি নির্ভুল ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করা হয়। তিনি শুধু একজন জেনারেল ছিলেন না; ইরানের সামরিক ও কৌশলগত শক্তির কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন। এই হামলা ছিল যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো। ইরান প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দেয়, আর পুরো বিশ্ব নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করতে থাকে। এবার কি যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে?


ইরান দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। ইরাকে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো অঞ্চল। যদিও বড় ধরনের প্রাণহানি হয়নি, কিন্তু বার্তাটি স্পষ্ট ছিল- ইরান চুপ করে বসে থাকবে না।


এই মুহূর্তে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত সংকটজনক। দুই দেশই সামরিকভাবে শক্তিশালী, এবং যেকোনো ভুল সিদ্ধান্ত পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আগুনে জ্বালিয়ে দিতে পারত। মার্কিন জনগণের মধ্যেও বিভাজন তৈরি হয়। কেউ মনে করছিল এটি প্রয়োজনীয় শক্তি প্রদর্শন, আবার কেউ এটিকে অপ্রয়োজনীয় উসকানি হিসেবে দেখছিল।


ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে কঠোর অবস্থান বজায় রাখছিল, অন্যদিকে সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছিল। এটি ছিল এক ধরনের ‘ব্যালান্সিং অ্যাক্ট’। একদিকে শক্তি প্রদর্শন, অন্যদিকে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে পিছিয়ে থাকা।


অনেক বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্পের কৌশল ছিল “ম্যাক্সিমাম প্রেসার”। অর্থাৎ অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সামরিক সব দিক থেকে চাপ সৃষ্টি করে ইরানকে নতজানু করা। কিন্তু এই কৌশলই পরিস্থিতিকে এমন এক বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যায়, যেখানে একটি ছোট ভুলও বড় যুদ্ধের কারণ হতে পারত।


তবে যুদ্ধটি তখন শুরু না হলেও বর্তমান সময়ে ইরান আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যা চলছে তা সে সময়েরই ফল। ইরান শান্তির অপেক্ষা করলেও ট্রাম্প তা রক্ষা করেনি। ইস্রায়েল কে খুশি করতে ট্রাম্প ইরানের কলিজায় হাত দিয়েছে। দেশের সরবোচ্চ নেতাকে হত্যার মাধ্যমে যুদ্ধের সূচনা করেছে।


সেদিন ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বেলা ১১টায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হোয়াইট হাউসে যান ট্রাম্পের সাথে দেখা করতে। নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তগুলোর একটির জন্য তখন প্রস্তুত ছিলেন নেতানিয়াহু, যিনি ইরানে হামলা করতে যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করাতে বহু মাস ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন।


ট্রাম্প কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে নিয়ে গেলেন, তার এই বিবরণ নেওয়া হয়েছে আসন্ন একটি বইয়ের জন্য করা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে। বইটির নাম ‘রেজিম চেঞ্জ: ইনসাইড দি ইমপেরিয়াল প্রেসিডেন্সি অব ডোনাল্ড ট্রাম্প’। এর প্রতিবেদনগুলো দেখায়, বহু মাস ধরে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানরে সঙ্গে কীভাবে নেতানিয়াহুর ভাবনার মিলমিশ হয়েছিল।


১১ ফেব্রুয়ারি সিচুয়েশন রুমে নেতানিয়াহু নিজের প্রস্তাব তুলে ধরেন জোরালোভাবে। তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানে শাসন পরিবর্তনের সুর্বণ সুযোগ এখনই। তিনি এ কথাও বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযান শেষ পর্যন্ত ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটাতে পারে।


নেতানিয়াহু ও তাঁর কর্মকর্তারা কয়েকটি পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন, যেগুলোকে তাঁরা প্রায় নিশ্চিত জয়ের ইঙ্গিত হিসেবে দেখান। তাঁদের মতে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ধ্বংস করা সম্ভব। তখন সরকার এতটাই দুর্বল হয়ে পড়বে যে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারবে না। আর আশপাশের দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ইরানের আঘাত হানার সম্ভাবনাও খুব কম। এমন মূল্যায়নই তুলে ধরা হয়।


এ ছাড়া মোসাদের গোয়েন্দা তথ্য বলছিল, ইরানের ভেতরে রাস্তায় আবার বিক্ষোভ শুরু হবে। একদিকে বোমা হামলা চলবে, অন্যদিকে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা দাঙ্গা ও বিদ্রোহ উসকে দিতে সাহায্য করবে, তাতে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে যে ইরানের বিরোধী পক্ষই সরকারকে উৎখাত করে ফেলতে পারবে।


ইসরায়েলিরা এই সম্ভাবনার কথাও তোলে যে ইরানি কুর্দি যোদ্ধারা ইরাক থেকে সীমান্ত পেরিয়ে উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে স্থলযুদ্ধের একটি নতুন ফ্রন্ট খুলতে পারে। এতে সরকারি বাহিনীকে আরও ছড়িয়ে পড়বে এবং এতে সরকারের পতন ত্বরান্বিত হবে।


মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষণের ফলাফল জানানো হয় পরের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি। যুদ্ধ শুরু হলে  হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখা বিশাল কঠিন কাজটির কথাও তোলেন জেনারেল কেইন এবং ইরানের দিক থেকে এটি বন্ধ করে দেওয়ার ঝুঁকির কথাও বলেন। তবে ট্রাম্প এই সম্ভাবনাকে তেমন গুরুত্ব দেননি। তাঁর ধারণা ছিল, পরিস্থিতি এত দূর যাওয়ার আগেই ইরানের সরকার নতি স্বীকার করবে।


প্রেসিডেন্টের মনে হচ্ছিল, যুদ্ধটি খুব দ্রুত শেষ হবে। জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন বোমা হামলার পর তুলনামূলক দুর্বল প্রতিক্রিয়া তাঁর এই ধারণাকে জোরদার করেছিল।


প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনেক উপদেষ্টা নেতানিয়াহুকে বিশ্বাস করতেন না। তবু পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গি ট্রাম্পের মতের কাছাকাছি ছিল। বহু বছর ধরেই তা সত্য ছিল। একটি বিষয় নেতানিয়াহুর প্রস্তাবের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল, তা হলো ১৯৭৯ সালে ক্ষমতা নেওয়া ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের সময় ট্রাম্পের বয়স ছিল ৩২। তারপর থেকে এই শাসনব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটানা কাঁটার মতো ছিল।


ট্রাম্প ভাবতে চাইছিলেন, তিনিই হতে পারবেন প্রথম প্রেসিডেন্ট, যিনি ইরানে শাসন পরিবর্তন ঘটাবেন। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকের দিনগুলোয় আমেরিকান ও ইসরায়েলিরা একটি নতুন গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে আলোচনা করেন, যা তাদের সময়সূচি অনেক এগিয়ে দেয়।


আয়াতুল্লাহ খামেনি বাংকার ছেড়ে মাটির ওপরে বৈঠক করবেন অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে। সেটি হবে দিনের আলোয় আর আকাশপথে হামলার জন্য জায়গাটি পুরো খোলা থাকবে। এটি ছিল ইরানের নেতৃত্বের কেন্দ্রে আঘাত হানার ক্ষণস্থায়ী একটি সুযোগ। এমন লক্ষ্য হয়তো আবার সামনে নাও আসতে পারত।


ট্রাম্প ইরানকে আরেকটি সুযোগ দেন, যাতে তারা এমন একটি চুক্তিতে আসে, যা তাদের পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়ার পথ বন্ধ করবে। নেতানিয়াহু তাঁকে দ্রুত এগোতে চাপ দিচ্ছিলেন।


২৬ ফেব্রুয়ারি, বিকেল প্রায় ৫টার দিকে সিচুয়েশন রুমে চূড়ান্ত বৈঠক শুরু হয়। কিন্তু জেনারেল কেইন তখন বলেন, পরদিন বিকেল ৪টা পর্যন্ত যেন হামলার অনুমোদন দেওয়া না হয়।পরের দিন বিকেলে এয়ার ফোর্স ওয়ানে জেনারেল কেইনের দেওয়া সময়সীমার ২২ মিনিট আগে ট্রাম্প  নির্দেশ পাঠান– ‘অপারেশন এপিক ফিউরি অনুমোদিত। কোনো বাতিল নয়। শুভকামনা।’ যার ফলশ্রুতিতে ২৮ই ফেব্রুয়ারি ইরানের নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উপর আক্রমণ করা হয়।

 

ট্রাম্প সব সময় একরোখা। তিনি তাই শুনতে চান যা তিনি ঠিক করেছেন। ইস্রায়েলের সাথে মিলে তিনি যে কাজটি করেছেন তার প্রেক্ষাপট যে এমনটা হবে তা তিনি ধারনাও করেননি। যুদ্ধ চলমান। বিশ্ব আজ অচলের পথে। হরমুজ প্রণালী অবরোধ। তেলের বাজার আগুন। অর্থনীতি ভয়ে কাপছে। সবার একটাই প্রশ্ন-আমরা কি শেষ যুদ্ধের মুখোমুখি? উত্তর টা অজানা।

 

অনেক চেষ্টার পরে যুদ্ধ বিরতি মানলেও কোনো সমাধান হয়নি। কোনো পক্ষই তাদের কোনো শর্ত মেনে নেয়নি। এ মুহূর্তে অপেক্ষা আর প্রার্থনা করা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url