পৃথিবীর ভেতরের যে রহস্য আগ্নেয়গিরি এবং ভূমিকম্পের জন্য দায়ী
আপনি কি কখন ও ভেবে দেখেছেন, পৃথিবীর বুক চিরে হঠাৎ করে জেগে ওঠা সেই বিশাল আগ্নেয়গিরি গুলোর ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত আসলে কেন ঘটে?
এই ভয়ানক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পেছনে লুকিয়ে আছে কোটিকোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস এবং জটিল প্রাকৃতিক বিজ্ঞান। আজকের ভিডিওতে আমরা জানবো, কীভাবেআগ্নেয়গিরির ভেতরে জমে থাকা উত্তপ্ত ম্যাগমা ছুটে বেরিয়ে আসে, কীভাবে গঠিত হয় এই বিশাল শক্তির উৎস, এবং কিসের কারণে হঠাৎ করে ঘটে ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত।
আগ্নেয়গিরি মূলত পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা গলিত শিলা, যাকে আমরা ম্যাগমা বলি।পৃথিবীর ভূত্বকের নিচে রয়েছে ম্যান্টল নামের স্তর, যেখানে তাপমাত্রা এতটাই বেশি যে পাথরও গলে গিয়ে তরল হয়ে যায়। এই গলিত পদার্থ বিভিন্ন সময় চাপে, ভূমিকম্পে বা প্লেটের নড়াচড়ার কারণে ওপরে উঠে আসে এবং নির্গত হয় পৃথিবীর পৃষ্ঠে। এটিই আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত।
অগ্ন্যুৎপাত সাধারণত কয়েকটি মূল ভূতাত্ত্বিক কারণে ঘটে:
বিজ্ঞানীদের তথ্য মতে , ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১ হাজার ২০০ মাইল নিচে থাকা রহস্যময় ব্লব অঞ্চলের জন্য অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটছে। ব্লব অঞ্চল টি বিভিন্ন মহাদেশ জুড়ে বিস্তৃত। মাউন্ট এভারেস্টের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি প্রসারিত এইসব এলাকা।
পৃথিবী পৃষ্ঠের ওপরের দিকে প্রবাহিত গরম গলিত শিলার স্তূপের জন্য একটি সূচনা বিন্দু বলা যায় এই ব্লব অঞ্চলকে। সেখানে ভয়ংকর মাত্রায় লাভা, গ্যাস ও শিলা খণ্ড বিস্ফোরিত হয়ে থাকে।গবেষকেরা জানিয়েছেন, ব্লব অঞ্চল গুলো সম্ভবত লাখলাখ বছর ধরে বিদ্যমান আছে।
ব্লবের অবস্থান পৃথিবীর আবরণের নিচে। আমাদের গ্রহ পৃষ্ঠের সবচেয়ে পুরুস্তর ম্যান্টেল মূলত একটি কঠিন শিলা। ব্লব ম্যান্টেলের বাকি অংশের মতোই পাথর দিয়ে তৈরি হতে পারে। পৃথিবীর পৃষ্ঠের নিচের ব্লব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থানান্তরিত হয়। ম্যান্টেল প্লামের মাধ্যমে পৃথিবীর পৃষ্ঠের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের স্থান ব্লবের অবস্থানের ওপরেই। এর থেকে বোঝা যায়, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মূল উৎস হচ্ছে এসব ব্লব।
অন্যান্যকারণগুলোহলো-
১. টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ বা বিচ্ছিন্নতা:
পৃথিবীর পৃষ্ঠ ভাগ অনেক গুলো বড় বড় প্লেট দিয়ে তৈরি ,যে গুলো কে বলে টেকটোনিক প্লেট। যখন এই প্লেট গুলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায় বা দূরে সরে যায়, তখন ওই স্থান গুলোর নিচে থাকা ম্যাগমা ওপরে উঠে আসার সুযোগ পায়। এই ধরনের অঞ্চলকে বলা হয় "প্লেটবাউন্ডারি" বা "সীমান্তঅঞ্চল", যা আগ্নেয়গিরির জন্য খুবই ঝুঁকি পূর্ণ।
২.ম্যান্টল প্লুম বাহট স্পট:
পৃথিবীর অভ্যন্তরে কিছু নির্দিষ্ট জায়গায় থাকে স্থায়ী গরম বিন্দু , যে গুলো কে বলা হয় হট স্পট। হাওয়াই দ্বীপ পুঞ্জ এরকম হটস্পটের উপরেই তৈরি। এই জায়গায় ম্যান্টল থেকে নিয়মিত ভাবে ম্যাগমা উঠে আসে, এবংএতে তৈরি হয় আগ্নেয়গিরি।
৩. ভূগর্ভস্থ গ্যাস চাপ:
ম্যাগমার মধ্যে থাকা গ্যাস-বিশেষ করে জলীয় বাষ্প, কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবংসালফার-ডাই-অক্সাইড ,যখন চাপে জমা হতে থাকে, তখন একসময় এটি বিস্ফোরণের মতো করে বাইরে ছুটে আসে। অনেকটা সোডা বোতলের ঢাকনা খুলে দেওয়ার মতো! এর ফলে ঘটে ভয়ানক অগ্ন্যুৎপাত।
৪. জল ও ম্যাগমার মিথস্ক্রিয়া:
অনেক সময় সমুদ্র বা হ্রদের নিচে থাকা আগ্নেয়গিরির ভিতর ম্যাগমা চলে আসে পানির সংস্পর্শে। এই পানি সঙ্গে গরম ম্যাগমার প্রতিক্রিয়া ঘটিয়ে তৈরি করে বিশাল বিস্ফোরণ। এটি কে বলে ফ্রেটো ম্যাগমাটিক ইরাপশন।
তবে অগ্ন্যুৎপাত সব সময় একই রকম হয়না। এগুলোর ধরন নির্ভর করে ম্যাগমার প্রকৃতি, গ্যাসের চাপ এবং প্লেট গতিশীলতার ওপর। কিছু সাধারণ ধরন হলো:
১. এক্সপ্লোসিভ ইরাপশন (বিস্ফোরণধর্মী):
এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক। হঠাৎ করে প্রচণ্ড গ্যাস চাপে আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়ে এবং ছড়িয়ে দেয় ছাই, পাথর ও গলিত লাভা।
2. এফুসিভ ইরাপশন (নরমধারা):
এতে লাভা ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে এবং আশে পাশে ছড়িয়ে পড়ে। এটি অপেক্ষাকৃত কম বিপজ্জনক।
৩. স্ট্রাটোভলক্যানো বা কম্পোজিট আগ্নেয়গিরি:
এই ধরনের আগ্নেয়গিরি বারবার অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে স্তরে স্তরে তৈরি হয় এবং অনেক বড় ও বিপজ্জনক হয়।
অনেক সময় বিজ্ঞানীরা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত আগে থেকেই শনাক্ত করতে পারেন। কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো: মাটির নিচে কম্পন বা ভূমিকম্প, ভূমির উঁচু নিচু হওয়া, তাপমাত্রা ও গ্যাস নিঃসরণ বেড়ে যাওয়া, আগ্নেয়গিরির গহ্বর থেকে ধোঁয়া বা ছাই বের হওয়া।
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত শুধু আগুন বা লাভা দিয়ে ক্ষতি করেনা। এটি পরিবেশ ও মানব জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। প্রাণহানি ও ঘরবাড়ি ধ্বংস, বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাসকষ্ট বা মৃত্যু, কৃষিকাজ ধ্বংস এবং খাদ্য ঘাটতি, উড়োজাহাজ চলাচলে বাধা এবং জলবায়ুর সাময়িক পরিবর্তন।একটা বড় উদাহরণ হলো ১৯৯১ সালের মাউন্ট পিনাটুবোর অগ্ন্যুৎপাত, যা পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রায় ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমিয়ে দিয়ে ছিল কয়েক বছরের জন্য।
আগ্নেয়গিরি পৃথিবীর অভ্যন্তরের শক্তির একটি ভয়ঙ্কর প্রকাশ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে আছি এবংসেই প্রকৃতি কে বোঝা, পর্যবেক্ষণ করা ও সম্মান করা জরুরি। বিজ্ঞানীদের অবিরাম গবেষণার মাধ্যমে আমরা আগ্নেয়গিরির আচরণকে কিছুটা বুঝতে পারলেও, এর অনেক কিছুই আজও রহস্যঘেরা।
আপনারা যদি আগ্নেয়গিরি নিয়ে এমন আরও আকর্ষণীয় তথ্য জানতে চান, তাহলে কমেন্ট করে জানান- এবং বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।
