পেত্রা নগরীর রহস্যময় ইতিহাস | Petra City History

petra-treasury-al-khazneh-jordan

ভাবুন, আপনি হাঁটছেন একটি অন্ধকার, সরু পাথুরে গিরিখাতের মধ্য দিয়ে। দুই পাশে প্রায় ৮০ মিটার পর্যন্ত উঁচু পাথরের দেয়াল। হঠাৎ সামনে আলো দেখা গেল আর গিরিখাত শেষ হতেই আপনার চোখের সামনে উঠে এলো একটি বিশাল স্থাপনা- পুরো পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা!


এটা কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়। এটি বাস্তব। এটিই- পেত্রা। জর্ডানের মরুভূমির বুকে, প্রায় দুই হাজার বছর ধরে ইতিহাসের স্তর লুকিয়ে রাখা এক প্রাচীন নগরী। 


পেত্রাকে প্রায়ই বলা হয়- Rose City, অর্থাৎ গোলাপি শহর। কারণ সূর্যের আলোয় এর লালচে, গোলাপি ও কমলা বেলেপাথরের পাহাড় অসাধারণ রঙ ধারণ করে।


কিন্তু পেত্রার সৌন্দর্যের পেছনে শুধু প্রকৃতির ভূমিকা ছিল না। মানুষ এই পাহাড়কেই পরিণত করেছিল স্থাপত্যের বিশাল ক্যানভাসে। 


তাহলে এই অসাধারণ নগরী কারা তৈরি করেছিল?

পেত্রার ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছে Nabataeans বা নাবাতীয়রা। তারা ছিল প্রাচীন আরব বিশ্বের একটি শক্তিশালী জনগোষ্ঠী, যারা পেত্রাকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিল।


খ্রিস্টপূর্ব কয়েক শতাব্দী থেকেই এই অঞ্চলে নাবাতীয়দের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো একটি মরুভূমির শহর এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল কীভাবে? এর সহজ উত্তর- বাণিজ্যের কারণে। 


পেত্রা ছিল প্রাচীন বাণিজ্য পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আরব উপদ্বীপ, লেভান্ত ও ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বের মধ্যে চলাচলকারী বণিকদের পথের সঙ্গে এর সংযোগ ছিল। ধূপ, মশলা এবং অন্যান্য মূল্যবান পণ্য এই বিস্তৃত বাণিজ্য নেটওয়ার্কের অংশ ছিল। 


 কিন্তু এখানে আসে আরও বড় প্রশ্ন। তা হলো - পেত্রা তো মরুভূমির অঞ্চলে। তাহলে হাজার হাজার মানুষ এখানে বেঁচে থাকত কীভাবে?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে পেত্রার সবচেয়ে অসাধারণ প্রযুক্তিগত সাফল্যের মধ্যে। সেটি হলো - পানি ব্যবস্থাপনা।


নাবাতীয়রা ঝরনা, বৃষ্টির পানি এবং প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। পেত্রার চারপাশের শুষ্ক পরিবেশে আকস্মিক বন্যাও বিপজ্জনক ছিল। তাই নাবাতীয়রা জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য বাঁধ, চ্যানেল ও অন্যান্য প্রকৌশল ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। অর্থাৎ - পেত্রা শুধু পাহাড় কেটে তৈরি করা স্থাপত্যের শহর ছিল না। এটি ছিল একটি অত্যন্ত পরিকল্পিত মরুভূমি নগরী।


এবার সামনে আসে পেত্রার সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনা Al-Khazneh, যাকে সাধারণভাবে বলা হয় ‘The Treasury’। কিন্তু নামটি শুনে ভুল করবেন না। এটি কোনো প্রমাণিত প্রাচীন ধনভাণ্ডার ছিল না। প্রত্নতাত্ত্বিক ও গবেষণামূলক ব্যাখ্যায় এটিকে সাধারণত একটি monumental tomb বা সমাধি স্থাপনা হিসেবে দেখা হয়।


এখন আসি আসল রহস্যে। এই বিশাল facade তৈরি হয়েছিল কীভাবে?

নাবাতীয় কারিগররা বেলেপাথরের পাহাড়ের গায়ে সরাসরি খোদাই করে স্থাপত্য তৈরি করেছিল। গবেষকদের মতে, নির্মাণের ক্ষেত্রে উপরের দিক থেকে নিচের দিকে খোদাই করার পদ্ধতি ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ তারা প্রথমে পাহাড়ের ওপর উঠে কাজ শুরু করত, তারপর ধীরে ধীরে নিচের দিকে এগিয়ে আসত। 


তবে পেত্রা মানেই শুধু সেই বিখ্যাত Treasury নয়। পুরো প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা জুড়ে রয়েছে অসংখ্য সমাধি, মন্দির, ধর্মীয় স্থাপনা, আবাসিক এলাকা, রাস্তা এবং জনজীবনের অন্যান্য নিদর্শন। অর্থাৎ আমরা যে facade দেখি, তার পেছনে ছিল একটি বিশাল নগর সভ্যতা। কিন্তু কোনো সাম্রাজ্যই চিরকাল শক্তিশালী থাকে না।


খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীর শুরুতে রোমান শক্তি এই অঞ্চলে ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। অবশেষে ১০৬ খ্রিস্টাব্দে, সম্রাট Trajan-এর সময় নাবাতীয় রাজ্য রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। পেত্রার স্বাধীন রাজনৈতিক ক্ষমতার ইতিহাসে এটি ছিল এক বড় মোড়। 


রোমান যুগের পরও পেত্রা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়নি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাণিজ্যপথের পরিবর্তন, অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন কারণ শহরটির গুরুত্ব কমিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে একসময়কার ব্যস্ত নগরী পরিণত হয় প্রায় বিস্মৃত এক প্রত্নস্থানে। 


শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পেত্রা পশ্চিমা বিশ্বের কাছে প্রায় অজানা ছিল। তারপর ১৮১২ সালে সুইস অভিযাত্রী Johann Ludwig Burckhardt ইউরোপীয় বিশ্বের কাছে পেত্রাকে পুনরায় পরিচিত করে তোলেন।


আজ পেত্রা একটি প্রত্নতাত্ত্বিক বিস্ময়। কিন্তু এর আসল সৌন্দর্য শুধু পাথরের facade-এ নয়। একটি মরুভূমি অঞ্চলে কীভাবে মানুষ বাণিজ্যিক শক্তি তৈরি করেছিল, কীভাবে পাহাড় কেটে স্থাপত্য সৃষ্টি করেছিল, কীভাবে পানি নিয়ন্ত্রণ করে নগরজীবন গড়ে তুলেছিল আর কীভাবে সময়ের পরিবর্তনে সেই নগরী ইতিহাসের স্তরের নিচে হারিয়ে গিয়েছিল ?


পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা এই শহর আমাদের একটি কথা মনে করিয়ে দেয় সভ্যতা শুধু বিশাল ভবন তৈরি করার নাম নয়। সভ্যতা হলো এমন একটি জায়গায় জীবন তৈরি করা, যেখানে প্রকৃতি আপনাকে বাঁচার কোনো সহজ সুযোগ দেয়নি।


নাবাতীয়রা মরুভূমিতে পানি খুঁজে পেয়েছিল। পাথরের পাহাড়ে শহর গড়ে তুলেছিল। আর বাণিজ্যের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব ছড়িয়ে দিয়েছিল বিশাল এক অঞ্চলে।


আজ তাদের সাম্রাজ্য নেই। বণিকদের কাফেলা নেই। পুরনো বাজারের কোলাহল নেই। কিন্তু পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা পেত্রা এখনো দাঁড়িয়ে আছে। নীরবে যেন একটি প্রশ্ন করছে - ‘যে মানুষগুলো এই শহর বানিয়েছিল, তারা যদি এত কিছু করতে পারে- তাহলে তাদের সভ্যতার কত ইতিহাস এখনো আমরা আবিষ্কারই করতে পারিনি?’

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url