চীনের মহাপ্রাচীর | Great Wall of China Length Explained
হাজার হাজার কিলোমিটারজুড়ে পাহাড়, মরুভূমি আর দুর্গম ভূখণ্ড অতিক্রম করে এগিয়ে গেছে এই বিশাল প্রাচীর। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পাহাড়ের ওপর দিয়ে একটি বিশাল সাপ এগিয়ে চলেছে। কিন্তু এর পেছনে ছিল সামরিক প্রতিরক্ষা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং অসংখ্য মানুষের কঠোর পরিশ্রমের ইতিহাস।সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো-চীনের মহাপ্রাচীর আসলে একটি মাত্র দেয়াল নয়!
এটি বিভিন্ন সময়ের অসংখ্য প্রাচীর, দুর্গ, গেট, টাওয়ার ও প্রতিরক্ষা কাঠামোর বিশাল নেটওয়ার্ক। আর এর পেছনে রয়েছে যুদ্ধ, সাম্রাজ্য, সীমান্ত রক্ষা এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের শ্রমের এক অবিশ্বাস্য ইতিহাস। অনেকে মনে করেন, চীনের মহাপ্রাচীর একজন সম্রাটের নির্দেশে একবারেই তৈরি হয়েছিল। এটি ভুল তথ্য।
বরং প্রাচীর নির্মাণের ইতিহাস দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত। বিভিন্ন রাজবংশ নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সীমান্তে দেয়াল ও প্রতিরক্ষা কাঠামো নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ এবং সম্প্রসারণ করেছে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে চীনের প্রথম সম্রাট Qin Shi Huang বিভিন্ন যুদ্ধরত রাজ্যকে একত্রিত করেন।
এরপর উত্তর সীমান্তে আগের রাজ্যগুলোর তৈরি কিছু প্রতিরক্ষা দেয়ালকে যুক্ত ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।এখান থেকেই মহাপ্রাচীরের ইতিহাসে আসে এক বিশাল পরিবর্তন। তবে আজ আমরা যে মহাপ্রাচীরের ছবি দেখি, তার বড় অংশ Qin যুগের নয়। বরং বর্তমানের সবচেয়ে বিখ্যাত ও সংরক্ষিত অংশগুলোর অধিকাংশই তৈরি হয়েছিল অনেক পরে Ming Dynasty-এর সময়ে, বিশেষ করে ১৪শ থেকে ১৭শ শতকের মধ্যে। তাহলে প্রশ্ন এই বিশাল প্রাচীরের প্রয়োজনই বা কেন হয়েছিল?
মূল উদ্দেশ্য ছিল উত্তর সীমান্তের সামরিক প্রতিরক্ষা। কিন্তু এটি শুধু একটি বাধা ছিল না। প্রাচীরের সঙ্গে যুক্ত ছিল watchtower, beacon tower, fortified passes এবং গেট। যেগুলো সৈন্যদের নজরদারি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশ ছিল। দূরের কোনো সীমান্তে শত্রুর গতিবিধি দেখা গেলে সংকেত পাঠানো যেত। বীকন টাওয়ার থেকে ধোঁয়া বা আগুনের সংকেত ব্যবহার করে দ্রুত খবর ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল।
অর্থাৎ, মহাপ্রাচীর ছিল শুধু পাথর আর ইটের দেয়াল নয়, এটি ছিল একটি সামরিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক। আরেকটি বিষয় হয়তো আপনাকে অবাক করবে। মহাপ্রাচীরের সব অংশ ইট ও পাথরের তৈরি নয়। কিছু প্রাচীন অংশে ব্যবহার করা হয়েছিল rammed earth বা মাটি স্তরে স্তরে চাপ দিয়ে তৈরি শক্ত দেয়াল। আবার Ming যুগের অনেক বিখ্যাত অংশে দেখা যায় ইট ও পাথরের ব্যবহার।
এখন আসে সবচেয়ে বড় সংখ্যাটি। চীনের সরকারি প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী, Ming Great Wall-এর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৮,৮৫০ কিলোমিটার।
আর বিভিন্ন যুগের Wall system, trenches এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা কাঠামো একত্র করলে UNESCO-র বর্ণনায় পুরো Great Wall system-এর বিস্তৃতি প্রায় ২০,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি।
তাই চীনের মহাপ্রাচীর কত লম্বা? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে আপনি কোন অংশকে Great Wall হিসেবে গণনা করছেন তার ওপর।
আজ আমরা যখন পাহাড়ের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সেই দেয়াল দেখি, তখন আসলে আমরা শুধু একটি স্থাপনা দেখি না। আমরা দেখতে পাই দুই হাজার বছরের ইতিহাস পাথর আর ইটের মধ্যে জমে আছে। আর প্রশ্নটা থেকেই যায় - এত বিশাল স্থাপনা তৈরি করার সাহস মানুষ প্রথম কোথা থেকে পেল?
