কাতার বিশ্বকাপে মুসলিমদের জন্য কেন নিষিদ্ধ ছিল MSC World Europa?
কাতার বিশ্বকাপকে সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ হিসেবে প্রবল কৌতূহল তৈরি হয়েছে। অমুসলিম ফুটবলার, ফুটবলারদের স্ত্রী, বান্ধবী কিংবা পরিবারকে ওই প্রমোদতরীতে রাখার বন্দোবস্ত করেছে ইসলামিক দেশ কাতার।
কাতারের হোটেল গুলোতে ভিন্ন ধর্মী বিদেশী খেলোয়াড় দের সঙ্গে তাদের পরিবার, স্ত্রী বা বান্ধবীদের রাখার বিষয়ে দ্বিমত পোষণ থেকেই এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলো কাতার বিশ্বকাপ ম্যানেজমেন্টে টিম। তাই বিশ্বে ওই প্রথম অন্য রাস্তায় হেঁটেছিল কাতার বিশ্বকাপ ফুটবল।
নিজেদের ভূমি এবং হোটেল সমূহকে অপবিত্রতার হাত থেকে রক্ষা করতে কাতার গ্রহণ করে এক অভাবনীয় উদ্যোগ। অমুসলিম দর্শনারথি দের জন্য নিজেদের হোটেলের পরিবর্তে ভাড়া করে নিয়েআসা হয়, আস্ত এক বিলাশবহুল প্রমোদ তরী এমএসসি ওয়ার্ল্ড ইউরোপা (MSC World Europa)।
কাতারের পাঁচতারকা হোটেলের স্বাচ্ছন্দ্যকে হার মানিয়েছে ওই প্রমোদতরী। রেস্তোরাঁ, সেলুন, স্পা, বুটিক হাউস তো ছিলোই, তারপরও আলাদা অনুমতি আদায় করে পানশালার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিলো সেই প্রমোদ তরীতে।
আলাদা অনুমতি নেওয়ার কারণ, কাতারে মদ্যপান কঠোরভাবে নিষিদ্ধ তাই। বাস্কেটবল কোর্ট, ফুড কোর্ট থেকে প্লে স্টেশন, বিনোদনের যাবতীয় মশলা সবটাই মজুত ছিলো সমান তালে। সবমিলিয়ে এক কথায়,- এলাহি কারবার। ফুটবলার সহ ভিনদেশি নাগরিকদের তোষামোদ করে রাখতে কোনও কার্পণ্যতা ছিলো না।
হোক ক্রিকেট বা ফুটবল বিশ্বকাপ। বেশির ভাগ সময়ই খেলোয়াড়দের স্ত্রী-বান্ধবী বা প্রেমিকারা দলবেঁধে ছুটে যান বিশ্বকাপ দেখতে। বিশেষ করে ফুটবল বিশ্বকাপ হলে তো আর কথা-ই নেই। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
বিশ্বকাপ দলের ফুটবলারদের স্ত্রী-বান্ধবীরা দলবেঁধে হাজির ছিলেন কাতারে। তবে খেলোয়াড়দের সঙ্গে নয়, কাতারে তারা ছিলেন ভূমী থেকে বিচ্ছিন্ন সমুদ্রের নীল জলে ভাসমান বিলাসবহুল এই প্রমোদতরীতে।
কাতারের সাথে বিভিন্ন দেশের আবহাওয়ার ভিন্নতা রয়েছে, তবে তার চেয়েও বড় ভিন্নতা নারীদের পোশাক আইনে। মেসি, হ্যারি কেন, নেইমার, স্টার্লিং, ফিল ফোডেনদের স্ত্রী বা প্রেমিকারা নিজ দেশে যেভাবে খোলামেলা পোশাক পরে ঘুরে বেড়ান, কাতারে সেটা প্রকাশ্যে করতে পারবেন না।
মুসলিম দেশ হিসেবে কাতারে তাদেরকে মুসলিম নারীদের ড্রেস-কোড মেনে চলতে হয়েছে। অতীতের সব অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার কারণে প্রথমে ফুটবলারদের স্ত্রী এবং বান্ধবীদের কাতারে আসতে না দেওয়ার কথাই ভেবেছিল কাতার বিশ্বকাপ আয়োজকরা।
এ নিয়ে শুরু হয়েছিলো অনেক মতবিরোধ। অনেকে কাতার কে বিশ্বকাপ ফুটবলের অয়োজক থেকেও সরেযাওয়ার দাবি জানায়।
তবে শেষ পর্যন্ত নারীদের আসার অনুমতি দিয়েছে কাতার। তবে ফুটবলারদের স্ত্রী-বান্ধবীদের স্পষ্টই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তারা অবশ্যই কাতারের ড্রেস-কোড মেনে চলতে হবে। নির্দেশমতো তারা কাতারের ড্রেস-কোড অনুযায়ী মুসলিম মেয়েদের পোশাকের আদলে পোষাকও তৈরি করেছিলেন। অর্থাৎ কাতারে তাদের শরীর ঢাকা ছিলো বড় ডিলেঢালা পোশাকে।
কাতারে আসার অনুমতি পেলেও তারা কোনোভাবেই খেলোয়াড়দের সঙ্গে হোটেলে রাত কাটাতে পারেনি। কাতারে হ্যারি কেন, রহিম স্টার্লিংরা থাকবেন হোটেল ‘সুক আল ওয়াকরা’তে। আর তাদের স্ত্রী-বান্ধবীরা নিজেদের বাসস্থান হিসেবে বেছে নিয়েছেন রাসপ্রাসাদতুল্য প্রমোদতরীকে।
তা যেন সাধারণ কোনো সামুদ্রিক জাহাজ নয়, ঠিক যেন রাজপ্রাসাদ। নাম ‘এমএসসি ওয়ার্ল্ড ইউরোপা’। প্রমোদতরীটি তৈরিতে ব্যয় হয়েছে ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ব্রিটিশ পাউন্ড। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১১ হাজার ৪১৬ কোটি ২০ লাখ টাকা।
বিশ্বকাপ চলাকালে প্রমোদতরীটি কাতারের রাজধানী দোহার সমুদ্রবন্দরের নীল জলরাশিতে নোঙর করা ছিলো। কাতারে আসার অনুমতি পাওয়ার পর থেকেই প্রমোদতরীটিতে রুম বুকিং দেওয়া শুরু করেছিলো আগ্রহীরা।
সেলুন, বুটিক, রেস্তোরাঁ, বেয়ামাগার, পানসালা, বাচ্চাদের খেলার জন্য বাস্কেটবল কোর্ট, বাম্পার কার, রোলার ডিস্ক থেকে শুরু করে কোন কিছুর অভাব নেই প্রমোদতরীটিতে। তবে কঠিন শর্ত ছিলো একটাই, কোন মুসলিম যেন বিশেষ অনুমতি ছাড়া সেই প্রমোদতরীতে প্রবেশ করতে না পারে।
সুযোগ-সুবিধা, বিলাসিতা যেমন, তেমনি খরচার অঙ্কটাও ছিলো আকাশচুম্বী। জানা গেছে, প্রমোদতরীটিতে রাতপ্রতি রুম ভাড়া ৩০০ থেকে ৬৯০ ব্রিটিশ পাউন্ড। বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৪ হাজার ২৪৮ টাকা থেকে ৭৮ হাজার ৭৭১ টাকা!
এ তো গেল রাতপ্রতি সাধারণ রুমের ভাড়ার হিসেব। বিলাসবহুল কেবিন নিতে চাইলে রাতপ্রতি গুণতে হয়েছিলো ১৯০০ ব্রিটিশ পাউন্ড যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮ টাকা!
পুরো বিশ্বকাপ খেলা উপভোগ করতে হলে অন্তত মাসখানেক কাতারে থাকতে হয়েছিলো তাদের। যদি সর্বনিম্ন দামের রুমও ভাড়া নেয়, তা হলেও তাদের রমের ভাড়াবাবদ খরচ করতে হয়েছিলো ১০ লাখ ২৭ হাজার ৪৪০ টাকা! টাকার কথা না ভেবে আরাম আয়েশের জন্য এই প্রমোদতরীটিকেই বেছে নিয়েছেন তারা।
চলাফেরা, থাকায় আরাম-আয়েশ তো আছেই, বাসস্থান হিসেবে এই উচ্চ ভাড়ার বিলাসী প্রমোদতরীটি বেছে নেওয়ার অন্য একটা বিশেষ কারণও আছে। মুসলিম দেশ হিসেবে কাতারে মদপান এবং খোলামেলা চলাচলে নিষিদ্ধ; কিন্তু সাগরে ভাসমান প্রমোদতরীতে সেই নিষেধাজ্ঞা ছিলো না! প্রমোদতরীর ভেতরে ছিলো না কোন ড্রেস- কোডের বিধিনিষেধ।
মানে প্রমোদতরীর ভেতরে অবস্থানকালে নিজেদের ইচ্ছামতো খোলামেলা পোশাক পরে ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি সব কিছু খেতেও পারবে! শুধু ফুটবলারদের স্ত্রী-বান্ধবী বা প্রেমিকারাই নন, তাদের অনেকের সঙ্গে তাদের পরিবারের সদস্যরাও ছিলো সেই প্রমোদতরীটিতে।
